October 6, 2022

পিতৃদিবসে অনুষ্ঠিত হলো পুরুষ নির্যাতন বিরোধী আলোচনা সভা

শ্রীজিৎ চট্টরাজ – কলকাতা

এই বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার ১৯ জুন ছিল বিশ্ব পিতৃদিবস। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্থান, আমেরিকা ও চিন সহ ৮৭ টি দেশে পালিত হয় পিতৃদিবস। ১৮ জুন শনিবার মধ্য কোলকাতার আই সি সি আর সেমিনার গৃহে আন্তর্জাতিক পিতৃ দিবস যৌথ উদ্যোগে পালন করল মেন রাইট অ্যকটিভিস্ট অর্গানাইজেশন ও চাইল্ড রাইটস বডি। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন নির্যাতিত পুরুষের অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেত্রী নন্দিনী ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানটির সহ উদ্যোক্তা ছিল অল ইন্ডিয়া ব্রাদার্স ইউনিয়ন, রুদ্র ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, সমাজতান্ত্রিক বঙ্গীয় পুরুষ মঞ্চ ও চাইল্ড রাইটস বডি আয়ুষ্মান ইনিশিয়েটিভ ফর চাইল্ড রাইটস।

আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল উপেক্ষিত পিতা ও সন্তানের সম্পর্ক এবং পিতার অধিকার, দাম্পত্য কলহে সন্তান প্রতিপালনে পিতার নৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ডব্লিউ বি সি পি সি আর এর চেয়ারপার্সন অনন্যা চক্রবর্তী, দেব সাহিত্য কুটির প্রকাশনার পক্ষে রাজ্যশ্রী মজুমদার, রাজিকা মজুমদার,মনোবিদ পরমা গুপ্তা, অধ্যাপক দেবাঞ্জন ব্যানার্জি, অধ্যক্ষ সুমন মজুমদার,একক অভিভাবক অভিষেক পাল,সাহিত্যিক শ্বাশত নন্দী ও মানবধিকার সংগঠনের পক্ষে অরূপ মুখার্জি।

বক্তারা প্রত্যেকেই নারী পুরুষের সম্পর্কের পরিণতি বিয়ের ফলে যে সন্তানের জন্ম হয়, পরে দুপক্ষের বিচ্ছেদে সন্তানের অধিকার ভারতীয় আইনে নারীর পক্ষে যায়, পুরুষ ব্রাত্য হন। এটি যে শুধু আইনি ত্রুটি তা নয়, বিচারকদের মানসিক স্থিতিতে একটি সংস্কার কাজ করে সেকথা তুলে ধরেন।ভুক্তভোগী সন্তান থেকে দূরে থাকা পিতারা ব্যক্তি অভিজ্ঞতাও বলেন।

প্রতিবেদকের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে আয়ুষ্মান সংগঠনের সম্পাদক হিসাববিদ অরিজিৎ মিত্র জানান, সন্তান বিচ্ছেদের কষ্ট কি আমি নিজে ভুক্তভোগী। যদিও দীর্ঘ লড়াইয়ে আমি সন্তানের অধিকার পাই। কিন্তু আমি উপলব্ধি করেছিলাম, এই বঞ্চনার শিকার আমি শুধু নই, অসংখ্য পিতা আছেন। এমনই কিছু পিতা এবং সহমর্মী মানুষের সহযোগিতায় আমরা গড়ে তুলেছি আয়ুষ্মান সংগঠন। আমরা আইনি বেড়াজালের শিকার পিতার স্নেহ ও অধিকার থেকে বঞ্চিত সন্তানদের পাশে থেকে লড়াই করি। আগামী দিনে আশা করি আমাদের আন্দোলনে পূর্ণ সাফল্য আসবে। সন্তানের ভরণপোষণের ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক কারণেই নয়, যথার্থ পিতার ভূমিকা পালনে যে পিতারা মায়েদের তুলনায় কোনো অংশে কম নয় তা প্রমাণ করবো।

বিশেষ সাক্ষাৎকারে নির্যাতিত পুরুষদের সংগঠন অল বেঙ্গল মেন্স ফোরামের সভানেত্রী নন্দিনী ভট্টাচার্য বলেন, নারী পুরুষের অসাম্যের নিরিখে নারী নির্যাতন যতটা বিশ্বজুড়ে প্রচার পায়, পুরুষ নির্যাতন সেখানে ব্রাত্য। অথচ সমীক্ষা বলছে, নারীর চেয়ে পুরুষের আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। অন্যতম কারণ স্ত্রী ও স্ত্রীর পরিবারের অত্যাচার। সমীক্ষা এও বলছে, দেশে পুরুষ শিশু নির্যাতিত হচ্ছে ৫৩ শতাংশ। দাম্পত্য কারণে পুরুষ নির্যাতিতের হার শতকরা ১৮ শতাংশ। অথচ ইউ এন ও এখনও নারী নির্যাতনকে সমাজে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করলেও পুরুষের ক্ষেত্রে নীরব। পুরুষ যদি নারীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন সেক্ষেত্রে কোনো মেডিকেল পরীক্ষা হয় না। মেয়েরা একদিকে সমান অধিকারের দাবি তুলবে, আবার খোরপোষ চাইবে এই দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। যেদিন কাগজের পাতায় দেখবো, কোনও আর্থিক স্বচ্ছল মেয়ে কোনো বেকার ছেলেকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে, বা কোনো আর্থিক স্বচ্ছল মেয়ে বিচ্ছেদের মামলায় বেকার বা আর্থিক দুর্বল স্বামীকে খোরপোষ দিতে চাইছে সেদিন বুঝব সমাজে সাম্য এসেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথা বলা হয়, কিন্তু সেই পুরুষতান্ত্রিক শোষণের অনেকটাই ভূমিকা থাকে মেয়েদের। দজ্জাল শাশুড়ি , ননদের শব্দের উৎপত্তি যেখানে। বিশিষ্ট মানবিক অধিকার রক্ষা সংগঠনের কর্মকর্তা হিসেবে অরূপ মুখার্জি বলেন, আমি ধানবাদের প্রবাসী বাঙালি ছিলাম। শৈশব কেটেছে বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমায় এক অখ্যাত গ্রামে। ভারতীয় বায়ুসেনায় কাজ করেছি। অবসরে একদিন অনুভব করেছি, আমার এই দেহ আমার নয়।সমাজের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। সমাজের কাছে আমি ঋণী। সমাজ আমাকে অনেক দিয়েছে।প্রতিদানে যতদিন আমার হৃদপিন্ড সচল থাকবে ততদিন আমি আমার সাধ্য মত সামাজিক কল্যাণে নিযুক্ত থাকবো। আমি নিজেও বৈবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। বেশ কয়েকবার ৪৯৮এ ধারায় অভিযুক্ত হয়েছি। তবে সমাজের দুটি মূল স্তম্ভ নারী পুরুষ। তাই আগামী পৃথিবী সুন্দর করে তুলতে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। সেকথা ভুলে ব্যক্তি স্বাভিমানকে গুরুত্ব দেওয়া অনুচিত। নারী পুরুষের দ্বন্দ্ব, অধিকারে সাম্যতা এসব কথার মাঝে মনে পড়ছে ষোড়শ শতকের বিশিষ্ট ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস্ এর সেই বিখ্যাত উক্তি। বিবর্তনের অন্যতম শর্ত নারীতে নারীতে, পুরুষে পুরুষে,পুরুষে নারীতে সংঘর্ষ । যা চলতেই থাকবে ।

About Post Author

Total Page Visits: 62 - Today Page Visits: 1