September 27, 2022

বাংলায় নাট্যচর্চায় নতুন ইতিহাস “শিল্পায়ন নাট্য বিদ্যালয়ের” শুভ সূচনা ১মে

সুজিৎ চট্টোপাধ্যায় –

নাটক ও বাঙালি প্রায় সমার্থক। ২৫০০ খ্রীষ্ট পূর্বে মিশরে প্রথম ধর্মী নাটক ‘মিথ অফ অসিরিজ এন্ড আইসিস’ যদি গ্রিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত হয়, ভারতের হিন্দু সংস্কৃতিও পিছিয়ে নেই। পুরাণ বলে, স্বয়ং ব্রহ্মা রচনা করেছিলেন প্রথম দেশজ নাটক সমুদ্রমন্থন। যা ইন্দ্রের সভায় প্রদর্শিত হয়। দ্বিতীয় নাটক ত্রিপুরাধা। যার রচয়িতা স্বয়ং শিব। তিনি এই নাটকের প্রধান দর্শকও বটে। দেশজ ইতিহাসে ভান, কালিদাস শুধু নন, রাজা হর্ষবর্ধন, রাজা শুদ্রকও নাট্য রচনা করেন। নাট্যশাস্ত্রের প্রবক্তা ভরত মুনিও আছেন। এত কিছুর পরেও কিন্তু দেশে নাট্য প্রচলনের ধারা কুসুমাতীর্ণ পথে চলেনি। মনুর বিধানে স্পষ্টতই নট ও নটীদের ব্রাত্য শুধু নয়, তাঁদের হাতে জলগ্রহণ পাপ বলা হয়েছে। বিশেষ করে নারী অভিনেত্রীর প্রতি আঙ্গুল উঠেছে। নটি বৃত্তিকে বলা হয়েছে কৌশীললব্যক্রিয়া।যা মনু শাস্ত্রে ৩৭নং উপপাপ।

বাংলায় ষষ্ঠ শতকে প্রথম সংস্কৃত নাটক পরিবেশিত হয় চার অঙ্কের চন্দ্রগামী। পরবর্তীসময়ে বাংলায় বাবু কালচারে অনেক নেতিবাচক কথা থাকলেও নাট্য শিল্পের প্রচারে তাঁদের একটি ইতিবাচক ভূমিকাও ছিল। রাশিয়ান নাট্য ব্যক্তিত্ব লেবেদফ থেকে গিরিশ ঘোষ । সে এক ইতিহাস। বাংলা নাটকে স্বামী স্ত্রীর অংশগ্রহণকেও বাঙালির উচ্চবর্ণের মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। ১৮৭৩ সালে বেঙ্গল থিয়েটারের পথ চলা শুরু হয় অভিনেত্রী গোলাপসুন্দরীর হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে সুবর্ণবণিক সমজের গোষ্ঠবিহারী দত্তের সঙ্গে বিয়ের জন্য ছড়া বাঁধা হয়েছিল, ‘আমি সখের পরী সুকুমারী, আমরা স্ত্রী পুরুষ অ্যাক্টো করি,দুনিয়ার লোক দেখে যারে।’

এরপর সময়ের স্রোতে বাংলা নাটক পৌঁছেছে স্বর্ণ শিখর প্রাঙ্গণে। কিন্তু সিনেমার দ্রুত বিস্তারে নাটক,যাত্রা তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারাতে থাকলো।পেশাদার নাটক যা বাণিজ্যিক নাটক নামে চিহ্নিত হয়েছিল, বাকি গ্রুপ থিয়েটার নামে চিহ্নিত হয়েছিল।এখন সেই রাম নেই, অযোধ্যাও নেই। তবু বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নাটক পাগল বাঙালি বছরভর মেতে থাকেন নাট্যচর্চায়। উত্তর চব্বিশ পরগনার এমনই এক শহর গোবরডাঙ্গা। নামে কিছুটা ভ্রূ কুঁচকোলেও বাঙালি জেনে অবাক হবেন, সংস্কৃতে গো শব্দের অর্থ পৃথিবী। আর বর শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ স্থান। সে অর্থে গোবরডাঙ্গার অর্থ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান। ইতিহাস বলছে , এখানে নাট্য সংস্কৃতির ধারা বেশ প্রাচীন। ১৮৫০ সালের জরিপে এখানে একটি গ্রামের উল্লেখ মেলে কানাই নাট্যশালা নামে। একসময় বলা হতো ভিলেজ অফ থিয়েটার। এখন বলা হয়, সিটি অফ থিয়েটার।

এখনকার ভূমিপুত্র রামধন তর্কবাগীশ, ভগবান বিদ্যালঙ্কার ,জরিপ বিশেষজ্ঞ প্রমথনাথ বসু, সাহিত্যিক প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, হাসিরাশি দেবী,প্রমুখ। বিদ্যাসাগরের সহযোগী শ্রীশ চন্দ্র মা সূর্যমণি দেবীর আপত্তি সত্বেও বাল্য বিধবা কালীমতীকে বিয়ে করেন। বিদ্যাসাগর মাইকেল মধুসূদনকে যে অর্থ সাহায্য করতেন, তাঁর সহযোগী ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র। গোবরডাঙ্গা রামকৃষ্ণ, বঙ্কিমচন্দ্র, দীনবন্ধু মিত্র, নজরুল, নেতাজি ও আলাউদ্দিন খাঁনের পদধূলি ধন্য। এখনকার নাট্যকর্মীদের খ্যাতি জগৎজোড়া। সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন স্বামী স্ত্রী জুটি অভিনেতা, পরিচালক, আশীষ চট্টোপাধ্যায় ও দীপা ব্রহ্ম। তাঁদের নাট্যদলের নাম শিল্পায়ন।

সোমবার বিকেলে গোবরডাঙায় তাঁদের উদ্যোগে নবতম প্রয়াস একটি নাট্য বিদ্যালয় ও নাট্য গবেষণা কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আগামী ১মে থেকে সেখানে নব কলেবরে শুরু হতে চলেছে নাট্য প্রশিক্ষণ ও পঠন পাঠন। এই অনন্য ভাবনার রূপকার অভিনেতা ,পরিচালক আশীষ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি নাট্য বিদ্যালয় স্থাপনের। যা আগামীদিনে একটি নন ফরম্যাল এডুকেশনের অঙ্গ হয়ে উঠবে। বড়দের পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের মননশীল বৈজ্ঞানিক পাঠক্রমের নির্দিষ্ট সময়সীমার শিক্ষাক্রমে ডিপ্লোমা প্রদান করা হবে। থাকছে নাট্য গ্রন্থালয়,আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ, দুই শয্য্যার ৪০ জনের আবাস গৃহ। গত ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী । রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নাটকপ্রিয় বহু নতুন প্রজন্ম যোগ দিয়েছেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে দুমাসের মধ্যে প্রকল্পটি বন্ধ করতে হয়। আবার নব কলবরে শুরু হতে চলেছে আগামী ১মে সকাল ১০ টায়।

প্রথাগত শিক্ষার অষ্টম শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীদের নাম মাত্র মূল্যে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকছে। শিক্ষার্থীরা কিস্তিতে তাঁদের দেয় অর্থ প্রদান করতে পারবেন। আশীষ চট্টোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের ২৪ লক্ষ টাকা সংগৃহীত হয়েছে। নাট্যদলের সদস্যদের অনেকে নিজেরা যথাসাধ্য অর্থ দান করেছেন তহবিলে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আশীষবাবুর স্ত্রী সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অভিনেত্রী দীপা ব্রহ্ম তাঁর ভবিষ্যতের সঞ্চয় সোনার গয়না বিক্রি করে এই প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করেছেন।

অভিনেত্রী দীপা ব্রহ্ম জানান, আমরা কৃতজ্ঞ রাজ্যের মন্ত্রী ও নাট্য ব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসুর কাছে।আমরা কৃতজ্ঞ ন্যাশানাল স্কুল অফ দরকার প্রশিক্ষক অমিত বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। স্থানীয় পুরপ্রধান সুভাষ দত্ত ৬ কাঠা জমি দান না করলে এই প্রকল্প কোনোদিন বাস্তবের মুখ দেখত না। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। বাজারে অনেক দেনাও হয়ে গেছে। আমরা জানি, আবেগ আর নাটকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে যে বন্ধুর পথ চলতে শুরু করেছি, তা হয়তো বাণিজ্যিক লাভ ক্ষতির চুলচেরা বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। কিন্তু একজন নাট্য আন্দোলনের কর্মী হিসেবে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করি কি করে?

এই প্রকল্পের আর এক অন্যতম প্রাণপুরুষ বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ বিদ্যামন্দিরের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দীপঙ্কর মল্লিক জানালেন, নাট্য বিদ্যালয় ভাবনায় স্টুডিও থিয়েটার গড়ে তোলার এক বৈপ্লবিক প্রচেষ্টায় সহযোগী হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল অফ থিয়েটার স্ট্যাডি। বেশ কিছু কলেজের সঙ্গে আমাদের কথা চলছে। চূড়ান্ত চুক্তি হলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের আর একটি ধাপ এগিয়ে যাবো। আমাদের এই শিক্ষাক্রমে শুধু,অভিনেতা তৈরির কাজ নয়, নাট্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত আলোকসজ্জা, রূপসজ্জা, মঞ্চসজ্জা,শব্দ প্রক্ষেপণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকগুলিকে সহ পাঠ্য শিক্ষাক্রম হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারিগরী শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাজ্যের সুদক্ষ প্রশিক্ষকদের সাহায্য নেওয়া হবে। আমাদের প্রেক্ষাগৃহে ,নাট্য প্রদর্শন,কর্মশালা, কক্ষ থাকছে যা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। থাকছে প্রসেনিয়াম ও নন প্রসেমিয়াম মাধ্যমের সুবিধা। থাকছে ভিডিও স্ক্রিন। প্রজেকশন রুম।

বাংলার নাট্য আন্দোলনে এই ত্রয়ীর প্রচেষ্টা দুঃসাহসিক নিঃসন্দেহে। নেতিবাচক পরিস্থিতিতে এঁদের এই প্রচেষ্টায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতাও শিল্পায়ন সংগঠনকে উৎসাহিত করছে সেকথাও জানালেন, সংগঠনের প্রাণপুরুষ অভিনেতা পরিচালক আশীষ চট্টোপাধ্যায়।

.

About Post Author

Total Page Visits: 158 - Today Page Visits: 1